ঢাকা | বঙ্গাব্দ

আজ ঐতিহাসিক ২৫ সেপ্টম্বর জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর প্রথম বাংলা ভাষায় ভাষণ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Sep 25, 2025 ইং
১৯৭৪ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘের ২৯তম সাধারণ অধিবেশনে বাংলা ভাষায় ভাষণ দেন। ছবির ক্যাপশন: ১৯৭৪ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘের ২৯তম সাধারণ অধিবেশনে বাংলা ভাষায় ভাষণ দেন।
ad728

আজ ঐতিহাসিক ২৫ সেপ্টেম্বর। ১৯৭৪ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘের ২৯তম সাধারণ অধিবেশনে বাংলা ভাষায় ভাষণ দেন। তিনিই জাতিসংঘের ইতিহাসে প্রথম বারের মতো বাংলা ভাষায় ভাষণ দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। আজ সেই দিন।

১৯৭৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ১৩৬তম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের মাত্র এক সপ্তাহ পর ২৫ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধুর মাতৃভাষা বাংলায় প্রদত্ত প্রজ্ঞাময় ঐতিহাসিক ভাষণ বাঙালি জাতিকে পৃথিবীতে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করে।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পিচঢালা পথে নিজেদের বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিল বাংলার ছাত্র-জনতা। এর ২২ বছর পর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আবার সমুন্নত হয় বাংলা ভাষার মর্যাদা। ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে মাতৃভাষা বাংলায় ভাষণ দিয়ে ইতিহাস গড়েন। সেদিনের পর জাতিসংঘে অনেকেই বাংলায় ভাষণ দিয়েছেন, কিন্তু বঙ্গবন্ধুই প্রথম ব্যক্তিত্ব যিনি জাতিসংঘে বাংলা ভাষায় প্রথম ভাষণ দেন।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ও বাংলা ভাষার এই উজ্জ্বল দিনেই বাংলায় দেওয়া বঙ্গবন্ধুর ভাষণের মাধ্যমে জাতিসংঘের সদস্য পৃথিবীর সব দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে জানতে পারে বাংলা ভাষার কথা, জানতে পারে বাংলা ভাষাভাষী বাঙালি জাতির জন্য রয়েছে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। তার নাম বাংলাদেশ।

এ বাংলাদেশ স্বাধীন করতে তিনি কোটি মানুষকে উন্মুখ করে তুলেছিলেন। তারও আগে যুক্ত হয়েছিলেন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবির আন্দোলনে। জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়ে সেই তিনি বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছিলেন বাংলা ভাষাকে।

সেদিন ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন, আজ এই মহামহিমান্বিত সমাবেশে দাঁড়াইয়া আপনাদের সঙ্গে আমি এই জন্য পরিপূর্ণ সন্তুষ্টির ভাগীদার যে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ আজ এই পরিষদে প্রতিনিধিত্ব করিতেছেন। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পূর্ণতা চিহ্নিত করিয়া বাঙালি জাতির জন্য ইহা একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার অর্জনের জন্য এবং একটি স্বাধীন দেশে মুক্ত নাগরিকের মর্যাদা নিয়া বাঁচার জন্য বাঙালি জনগণ শতাব্দীর পর শতাব্দীব্যাপী সংগ্রাম করিয়াছেন, তাঁহারা বিশ্বের সকল জাতির সাথে শান্তি ও সৌহার্দ্য নিয়া বাস করিবার জন্য আকাঙ্খিত ছিলেন।’

বঙ্গবন্ধু আরো বলেন, যে মহান আদর্শ জাতিসংঘ সনদে রক্ষিত আছে, আমাদের লক্ষ লক্ষ মানুষ সেই আদর্শের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করিয়াছেন। আমি জানি, শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সকল মানুষের আশা-আকাঙ্খা বাস্তবায়নের উপযোগী একটি বিশ্ব গড়িয়া তোলার জন্য বাঙালি জাতি পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, আমাদের এই অঙ্গীকারের সাথে শহীদানের বিদেহী আত্মাও মিলিত হইবে।’

ঐতিহাসিক এ দিনটির সূচনা হয় ১৯৭৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর, বুধবার। বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে বাংলাদেশকে জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্য রাষ্ট্ররূপে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়। এই ঘোষণাটি শোনার অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ বঙ্গবন্ধু তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, ‘আমি সুখী হয়েছি যে, বাংলাদেশ জাতিসংঘে তার ন্যায্য আসন লাভ করেছে। জাতি আজ গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে, যাঁরা বাংলাদেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে তাদের জীবন উৎসর্গ করে গেছেন; সেই শহীদদের কথা জাতি আজ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে।’

সেদিন বঙ্গবন্ধুকে প্রথমেই অনুরোধ করা হয়েছিল, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি ইংরেজিতে বক্তৃতা করবেন।’ কিন্তু প্রিয় মাতৃভাষা বাংলার প্রতি সুগভীর দরদ ও মমত্ববোধ থেকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করতে চাই।’ বঙ্গবন্ধুর বাংলা বক্তৃতার ইংরেজি ভাষান্তর করার গুরুদায়িত্বটি সেদিন অর্পিত হয়েছিল ফারুক চৌধুরীর ওপর। তিনি ছিলেন লন্ডনে বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার।

মাতৃভাষায় বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক বক্তৃতার পর অধিবেশনে সমাগত পাঁচটি মহাদেশের প্রতিনিধি এবং সমগ্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বহুল পঠিত জাতিসংঘের 'ডেলিগেট বুলেটিন' বঙ্গবন্ধুকে ‘কিংবদন্তির নায়ক মুজিব’ বলে আখ্যায়িত করে। বুলেটিনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়কের প্রদত্ত মন্তব্য-প্রতিক্রিয়া পত্রস্থ করা হয়। বুলেটিনের সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছিল, ‘এ যাবৎ আমরা কিংবদন্তির নায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের নাম শুনেছি। এখন আমরা তাঁকে কাজের মধ্যে দেখতে পাব।’ জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সম্পর্কে বলা হয়, ‘বক্তৃতায় ধ্বনিত হয়েছে মুজিবের মহৎ কণ্ঠ।’ জাতিসংঘ মহাসচিব ড. কুর্ট ওয়াল্ডহেইম তাৎক্ষণিক এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতায় আমি আনন্দিত ও গর্বিত। বক্তৃতাটি ছিল সহজ, গঠনমূলক এবং অর্থবহ।’ বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস কালাহান এই ভাষণ সম্পর্কে বলেন, ‘এটি ছিল একটি শক্তিশালী ভাষণ।’ কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই ভাষণকে ‘ইতিহাসের এক অবিচ্ছিন্ন দলিল’ হিসেবে অভিহিত করেন।

এ বছর ২৫ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ প্রদানের ৪৯তম বার্ষিকী উদ্যাপনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করে আজ বিভিন্ন কর্মসূচি উদযাপিত হবে।
অন্যদিকে, এই দিনটিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্য কর্তৃপক্ষ ২০১৯ সাল থেকে ‘বাংলাদেশি ইমিগ্র্যান্ট ডে’ হিসেবে পালন করে আসছে। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অন্যান্য অগ্রসর জাতির অভিবাসীদের সঙ্গে উজ্জ্বল পংক্তিভুক্ত হয় বাংলাদেশিরাও। এর আগে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সিনেটে একটি সেশনে আলোচনার পর আইন পরিষদে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেদিন জাতিসংঘে ভাষণ দিয়েছিলেন সেই ২৫ সেপ্টেম্বরকে ২০২১ সালের জন্য ধারাবাহিকভাবে তৃতীয় বছরের মত ‘বাংলাদেশি ইমিগ্র্যান্ট ডে’ ঘোষণা করা হয়। সে বছর ২১ জানুয়ারি মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বিশ্বজিত সাহা ও সেনেটর স্টেভেস্কি বিলটি নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের আইনপরিষদে উত্থাপন করেন। ২৬ জানুয়ারি সর্বসম্মতভাবে বিলটি পাস হয়।

নিউজটি আপডেট করেছেন : NS Abid Mahamud

কমেন্ট বক্স