গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সরকার। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গুম কোনো বিচ্ছিন্ন বা ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়; বরং নির্দিষ্ট সময়পর্বে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্পৃক্ততায় পরিচালিত একটি কাঠামোগত অপরাধ হিসেবে এটি সংঘটিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে কমিশন। মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) বিকেলে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার এ তথ্য জানান। কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়, রাজনৈতিক দমন, ভিন্নমত দমন এবং তথাকথিত সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের আড়ালে নিয়মিত পদ্ধতিতে গুমের ঘটনা ঘটানো হয়েছে। এসব ঘটনায় আটক বা গ্রেপ্তারের কোনো আইনগত নথি সংরক্ষণ করা হয়নি এবং ভুক্তভোগীদের পরিবারকে ইচ্ছাকৃতভাবে অন্ধকারে রাখা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গুমের ঘটনাগুলো একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পিত প্যাটার্ন অনুসরণ করে সংঘটিত হয়েছে এবং বিশেষ করে নির্বাচনকাল, সরকারবিরোধী আন্দোলন ও ছাত্র আন্দোলনের সময় এসব ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। কমিশন এসব ঘটনাকে ‘প্যাটার্ন বেইজড এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার পর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন অথবা পরে কোনো মামলায় হঠাৎ করে ‘গ্রেপ্তার দেখানো’ হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
কমিশনের মতে, গুমের প্রতিটি ঘটনাই বাংলাদেশের সংবিধান, প্রচলিত ফৌজদারি আইন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। এতে ব্যক্তিস্বাধীনতা, জীবনের অধিকার ও ন্যায়বিচারের অধিকার বারবার ক্ষুণ্ন হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর কার্যকর তদন্ত না হওয়ায় দেশে একটি বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। ভুক্তভোগী পরিবারকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, মামলা গ্রহণে অনীহা এবং স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থার অভাব এই দায়মুক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।
কমিশনের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, গুমের প্রভাব শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং পরিবার ও সমাজে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির সৃষ্টি করেছে। বহু পরিবার বছরের পর বছর অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর তাদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গুম বন্ধ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কমিশন সুপারিশ করেছে—গুমকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে আইনে অন্তর্ভুক্ত করা, জাতিসংঘের এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স কনভেনশন অনুসমর্থন, স্বাধীন ও শক্তিশালী তদন্ত ব্যবস্থা গঠন, দায়ীদের বিচার নিশ্চিত করা এবং ভুক্তভোগী পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ। প্রতিবেদনের শেষাংশে কমিশন সতর্ক করে বলেছে, গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার নিশ্চিত না হলে তা আইনের শাসন, গণতন্ত্র এবং রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
Revolt News BD