বাংলার আদি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও বিপ্লবী সাংস্কৃতিক ঐক্য এ বছর প্রথমবারের মতো পহেলা অগ্রহায়ণকে ‘বাংলার নববর্ষ’ হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ১ বৈশাখকে নববর্ষ হিসেবে উদ্যাপন করা হলেও, ঐতিহাসিক গবেষণা, কৃষিভিত্তিক বর্ষপঞ্জি ও প্রাচীন দলিলপত্রে অগ্রহায়ণ মাসকেই বছরের সূচনা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ডাকসু।
ডাকসুর সহসভাপতি ও অন্যান্য নেতাদের মতে, বাংলা সনের প্রাথমিক রূপ ছিল কৃষির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা। ধান কাটার মৌসুম, নবান্ন উৎসব, বছরের প্রথম ধাপের কৃষি–চক্র—সবই শুরু হতো অগ্রহায়ণে। তাই এ মাসকে "বছরের প্রথম মাস" হিসেবে নতুন করে সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। ডাকসুর নেতারা মনে করেন, ইতিহাস ও বাস্তবতার সঙ্গে সংযুক্ত থাকতেই ‘অগ্রহায়ণ নববর্ষ’ উদ্যাপনের ধারণা সামনে আনা হয়েছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছে ডাকসু
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ শিক্ষকরা জানান, মুঘল আমলে রাজস্ব আদায় সহজ করার জন্য সন সংশোধন করা হলেও, কৃষিভিত্তিক বাংলা বর্ষপঞ্জিতে দীর্ঘদিন অগ্রহায়ণ ছিল সনের প্রথম মাস। পরবর্তীতে বৈশাখকে নববর্ষ পালন হিসেবে জনপ্রিয় করা হয়। ডাকসুর দাবি, “বাংলা সনের আসল শিকড়কে প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতেই এই উদ্যোগ।”
ডাকসুর পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে,
“আমরা বৈশাখকে অস্বীকার করছি না; বরং বাংলার মূল, কৃষিভিত্তিক বর্ষপঞ্জিকে সম্মান জানাতে পহেলা অগ্রহায়ণকে নববর্ষ হিসেবে পালন করছি। ইতিহাস-ঐতিহ্য জানার অধিকার শিক্ষার্থীদের আছে।”
বর্ণাঢ্য ‘অগ্রহায়ণ উৎসব’ আয়োজন
এই সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে ডাকসু ক্যাম্পাসজুড়ে আয়োজন করতে যাচ্ছে বর্ণাঢ্য ‘অগ্রহায়ণ উৎসব’। জানা গেছে, অনুষ্ঠানে থাকবে—
১/ঐতিহ্যবাহী নবান্ন উৎসবের উপাদান
২/কৃষিনির্ভর বাংলার প্রতীকী প্রদর্শনী
৩/লোকসংগীত, পিঠা উৎসব ও গ্রামীণ মেলা
৪/ছাত্র–শিক্ষকদের অংশগ্রহণে শোভাযাত্রা
৫/বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা
৬/সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক আলোচনা সভা।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, ক্যাম্পাসজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ সাংস্কৃতিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে তারা ডাকসুকে সার্বিক সহযোগিতা করবে।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে উৎসাহ
ডাকসুর এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরাও। তাদের মতে, বহু প্রচলিত সংস্কৃতির আড়ালে হারিয়ে যাওয়া বাংলার কৃষি–ঐতিহ্যকে সামনে আনার দুঃসাহসিক পদক্ষেপ এটি।
এক শিক্ষার্থী বলেন,
“আমরা সবসময় বৈশাখ পালন করেছি, কিন্তু অগ্রহায়ণের ইতিহাস জানতাম না। ডাকসুর এই উদ্যোগ আমাদের শেকড় সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি করেছে।”
আরেকজন শিক্ষার্থী মন্তব্য করেন,
“নবযুগের বাংলা সংস্কৃতিকে ঐতিহাসিক ধারার সঙ্গে যুক্ত করতে এমন উদ্যোগ প্রয়োজন ছিল।”
নতুন আলোচনার জন্ম
ডাকসুর এই ঘোষণা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। ইতিহাসবিদ, সংস্কৃতিকর্মী ও গবেষকদের একাংশ বলছেন, এই উদ্যোগ ঐতিহাসিক সত্যের গবেষণামূলক পুনর্বিবেচনার সুযোগ সৃষ্টি করবে। তবে কেউ কেউ মনে করছেন, মূলধারায় দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত বৈশাখের নববর্ষ পালনের পাশাপাশি নতুন একটি উদ্যাপন যোগ হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
তবে ডাকসুর নেতারা পরিষ্কারভাবে জানিয়েছেন, তারা বিতর্ক নয়—আলোচনা চায়। বাংলার প্রাচীন বর্ষপঞ্জির প্রতি শ্রদ্ধা ও গবেষণার স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠাই তাদের মূল লক্ষ্য।
বাংলা সন, কৃষি-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির উৎসে ফিরে যাওয়ার এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে নতুন বিতর্ক ও নতুন আলোচনার জন্ম দেবে। তবে তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে বাংলার ইতিহাস পুনরুদ্ধারের চেষ্টাকে অনেকেই ইতিবাচকভাবে দেখছেন।
ডাকসুর আয়োজিত প্রথম ‘অগ্রহায়ণ নববর্ষ উৎসব’ তাই শুধু একটি উৎসব নয়—এটি বাংলা সংস্কৃতির শিকড়ে ফিরে যাওয়ার আহ্বানও বটে
Easin Arafat